প্রাক ইসলামী যুগে শহরবাসি ও মরুবাসি যাযাবরদের জীবনে আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থার প্রভাব সমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করো

প্রাক ইসলামী যুগে শহরবাসি ও মরুবাসি যাযাবরদের জীবনে আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থার প্রভাব সমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করো – ইসলামের আবির্ভাব মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এ মহান ধর্মের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী সময়কে “আইয়্যামে জাহেলিয়া” বা Age of ignorance বলা হয়ে থাকে। ‘আইয়্যামে জাহেলিয়া’ এটি আরবি শব্দ, আইয়্যাম শব্দটি বহুবচন, একবচনে ইয়াওমুন, ইয়াওমুন শব্দের অর্থ দিন, আর আইয়্যাম শব্দের অর্থ যুগ, জাহেলিয়া শব্দের অর্থ অজ্ঞতা, বর্বরতা বা অন্ধকার, আইয়্যামে জাহেলিয়া অর্থ অজ্ঞতা বা অন্ধকার যুগ।  

বলা যেতে পারে যে, মানসিকভাবে জাহেলিয়াত যুগের আরবগণ লোভী মানুষের পূর্ণাঙ্গ উপমা ছিল। পার্থিব বস্তুসামগ্রীর প্রতি ছিল তাদের দুর্বার আকর্ষণ। তারা প্রতিটি বস্তু বা বিষয়কেই তার অন্তর্নিহিত লাভ ও উপকারের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করত (অর্থাৎ যে জিনিসে যত বেশি লাভ ও উপকার পাওয়া যেত সেটিই তাদের কাছে প্রিয় ও কাম্য হতো)। তারা সর্বদা অন্যদের চেয়ে নিজেদের এক ধরনের উচ্চমর্যাদা, সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব আছে বলে বিশ্বাস করত। তারা সীমাহীনভাবে স্বাধীন থাকতে ভালবাসত। তাই যে সব বিষয় তাদের স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিত তা তারা মোটেও পছন্দ করত না।

ইসলাম পূর্ব যুগে আরবের সর্বত্র অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং আরব জীবনের সর্বক্ষেত্রে অজ্ঞতা বিরাজমান ছিল একথা যেমন বলা যায় না তেমনি প্রাক ইসলামি যুগকে ঢালাওভাবে আইয়্যামে জাহেলিয়া হিসেবেও অভিহিত করা যায় না।

প্রাক ইসলামি যুগের ধর্মবিশ্বাস:

আরব্য পুরাণ হলো আরব জাতির একগুচ্ছ প্রাক-ইসলামী প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস। ইহুদী খ্রিষ্টানদের এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী হলেও ক্রমেই তারা ধর্মের মূল ভিত্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। ইসলামের আগমনের পূর্বে, মক্কার কাবায় অসংখ্য দৈত্য, জিন, উপদেবতা বা সাধারণ আদিবাসী দেবতা ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি ছিল। এগুলি ছিল প্রাক-ইসলামী আরবের বহুদেববাদী সংস্কৃতির প্রতিভূ। আরবের ইতিহাসে পৌত্তলিকদের নাম ধাম বরাবরই আলোচিত। এর কারণ হিসেবের বলা যায় মক্কাকে কেন্দ্র করে পৌত্তলিকরাই স্বার্থের বিচারে এগিয়ে ছিলো। হজ্জ মৌসুমকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক দাপটে আরব ইতিহাসে যথাযথ ভাবে তাদের স্থাপন করে নেয়। মক্কার উপাসনালয়ের সর্বপ্রথম মূর্তির নাম ছিলো হোবল।

ধর্মীয় কুসংস্কার: 

আইয়্যামে জাহেলিয়া যুগে জাদু, টোটকা,তন্ত্র-মন্ত্র প্রভৃতি কুসংস্কারে সমগ্র আরব ছেয়ে যায়। “কাহিন” নামে পরিচিত ভাগ্য গণনাকারী ও ভবিষ্যদ্বক্তাগণ তাদের নিকট যথেষ্ট সম্মানিত ছিল। পরকালকে তারা বিশ্বাস করতো না। মৃত্যুকেই তারা জীবনের পরিসমাপ্তি বলে মনে করতো। 

প্রাক ইসলামি যুগের আরবের সাংস্কৃতিক অবস্থা :

আরবদের অসাধারণ স্মৃতিশক্তির ফলে প্রাক ইসলামি আরবের লোক-গাঁথা, প্রবাদ, লোকশ্রুতি সংরক্ষিত হয়। তারা স্মৃতিশক্তিবলে এক লক্ষের অধিক কবিতা সংরক্ষিত করে রাখে। তাদের সৃজনশীল প্রতিভার স্বাক্ষর পাওয়া যায় বক্তব্যে, কবিতা রচনায়, কুলজী সংরক্ষণে।

সাহিত্য চর্চা :

প্রাক ইসলামি যুগে কাসীদা বা গীতিকবিতা রচনা করে অশেষ কৃতিত্ব অর্জন করে। বাগ্মিতা ও গীতিকাব্য রচনায় আরবগণ সৃজনশীল মননশীলতার পরিচয় দেয়। 

প্রবাদ বাক্য ও গদ্য রচনা গীতিকাব্যের তুলনায় অপ্রতুল ছিল। তৎকালে বহু আরবি প্রবাদ সংগৃহীত ও সংরক্ষিত হয়েছিল। যেমন – “মানুষের সৌন্দর্য তার জিহবার বাচনশীলতার মধ্যে নিহিত”। ” বুদ্ধিমত্তা তিনটি বস্তুর উপর নিপতিত হয়েছে – ফরাসিদের মগজে, চীনাদের হস্তে এবং আরবিদের জিহবায়। “

প্রাচীন আরবি গীতিকাব্য অথবা কাসীদা সমসাময়িক কালের ইতিহাসে অতুলনীয় সম্পদ। এর বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ – বংশ-গৌরব, বীরত্বপূর্ণ কাহিনি, যুগের বিবরণ, যুদ্ধের ঘটনা, উটের গুণাবলি, নারী,প্রেম ইত্যাদি।

প্রাক ইসলামি যুগে আরবের সামাজিক ও নৈতিক অবস্থা: 

সমাজের অবস্থা :

মানব জাতি সামাজিক জীবনের দিকে প্রথম যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা ছিল গোত্রীয় জীবন। গোত্র ছিল কতগুলো পরিবার ও আত্মীয়ের সমষ্টি যারা গোত্রের শেখ বা নেতার নেতৃত্বাধীনে জীবনযাপন করত। প্রাক ইসলামি আরবের সামাজিক ও নৈতিক অবস্থা ছিল ভয়াবহ ও জঘন্য। বংশগত ও গোত্রগত আভিজাত্য, অহংকার, ঈর্ষা, বিদ্বেষ, অজ্ঞতা, বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিকতা সমাজকে কলুষিত করে তোলে। প্রতিটি গোত্র যখনই আগ্রাসন ও আক্রমণের শিকার হতো তখন সকল আগ্রাসনকারীকে হত্যা করা তাদের ন্যায্য অধিকার বলে গণ্য হতো। কারণ তারা বিশ্বাস করত যে, একমাত্র রক্ত ব্যতীত অন্য কিছু রক্তকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে সক্ষম নয়। আরবদের নিকট তিনটি জিনিস অত্যন্ত প্রিয় ছিল – সুরা( মদ), নারী, যুদ্ধ। সমগ্র আরবদেশ মূর্খতা, বর্বরতায় নিমজ্জিত ছিল। 

কন্যা সন্তান ও নারীর সামগ্রিক অবস্থা :

মহান আল্লাহ্‌ তৎকালীন নারীদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করা হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্নগোপন করে। সে চিন্তা করে হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে (কন্যাকে) রেখে দেবে না মাটিতে পুঁতে ফেলবে! সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত নেয় তা কত নিকৃষ্ট”। (সূরা আন-নাহলঃ ৫৮-৫৯)

দাসদাসীর অবস্থা :

প্রাচীনকাল থেকেই আরব সমাজে ক্রীতদাস প্রথা প্রচলিত ছিল। কিন্তু সমাজে তাদের কোনো মর্যাদা ও ব্যাক্তি স্বাধীনতা ছিল না। পণ্যের মতো তারা হাটে-বাজারে কেনা-বেচা হতো। প্রভুর মর্জির উপর তাদের জীবন নির্ভর করতো। এমনকি প্রভুর অনুমতি ছাড়া তারা বিয়েও করতে পারতো না।অনেক সময় দাসীরা প্রভুদের উপপত্নী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দাসদাসীর সন্তানের উপর প্রভুর মালিকানা ছিলো। 

অনাচার ও ব্যভিচার: 

নৈতিক অবনতি, মদপান, জুয়াখেলা, হত্যা, ব্যভিচার, অনাচার আরব সমাজকে কলুষিত করেছিল। অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে আরববাসীদের চরিত্রের মূলমন্ত্র ছিল তিনটি – “সুরা(মদ),নারী ও যুদ্ধ”। আরব সমাজে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ প্রথা প্রচলিত ছিল।

একদিকে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ও সঠিক কৃষ্টি-সংস্কৃতির অনুপস্থিতি এবং অন্যদিকে চরিত্রহীনতা ও কুসংস্কারের ব্যাপক প্রসারের কারণে আরব জাতির জীবন মানবেতর জীবনে পরিণত হয়েছিল। ইতিহাসের পাতা আরবদের পঞ্চাশ বছর ও একশ’ বছর স্থায়ী যুদ্ধের কাহিনী ও বিবরণে পূর্ণ। এ সব যুদ্ধ তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়েছে। 

প্রাক ইসলামি যুগে আরবের রাজনৈতিক অবস্থা :

গোত্রতান্ত্রিক শাসন:

প্রাচীন গোত্রতান্ত্রিক শাসনই ছিলো আরবদের রাজনীতি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। তাদের গোত্রপ্রীতি ও বন্ধনই ছিলো সুদৃঢ়। প্রত্যেক গোত্রে একজন শায়খ নির্বাচিত হতেন। বয়স, বিচার-বুদ্ধি, সাহস, পদমর্যাদা, আর্থিক অবস্থা ও অভিজ্ঞতা বিচার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শেখ নির্বাচিত হতেন। তার মেয়াদকাল নির্বাচকমণ্ডলীর সন্তুষ্টির উপর নির্ভর করতো। শেখের প্রতি আনুগত্য ছিল সর্বজনীন। গোত্রপতির পরামর্শ অনুযায়ী শাসন, বিচার ও যুদ্ধ ইত্যাদি সংঘঠিত হতো।

আরবে কোন কেন্দ্রীয় শাসন না থাকায় তারা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। গোত্রকে আরবিতে বলা হয় ‘কাবিলা’ আর প্রত্যেকটা গোত্র কতগুলো ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত ছিল। গোত্রের সেই অংশগুলোকে বলা হতো ‘কাউম’।

এইচএসসি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ১ম সপ্তাহ এসাইনমেন্ট উত্তর

Updated: July 27, 2021 — 9:20 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *