প্রাচীন মিসরীয়, সুমেরীয়, হিব্রু, গ্রিক ও রােমীয় সভ্যতা সমূহের উল্লেখযােগ্য অবদান পর্যালােচনা করে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন

প্রাচীন মিসরীয়, সুমেরীয়, হিব্রু, গ্রিক ও রােমীয় সভ্যতা সমূহের উল্লেখযােগ্য অবদান পর্যালােচনা করে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন

এইচএসসি 2022 ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ৬ষ্ঠ সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট এর প্রশ্ন তুলে ধরা হলো।

অ্যাসাইনমেন্ট ০১

প্রথম অধ্যায়ঃ প্রাক ইসলামি আবর

অ্যাসাইনমেন্টঃ

প্রাচীন মিসরীয়, সুমেরীয়, হিব্রু, গ্রিক ও রােমীয় সভ্যতা সমূহের উল্লেখযােগ্য অবদান পর্যালােচনা করে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন।

শিখনফলঃ

প্রাচীন সভ্যতাসমূহের বৈশিষ্ট্য এবং এগুলাের প্রভাব উল্লেখ করতে পারবে।

নির্দেশনাঃ

১. প্রাচীন সভ্যতা সমূহের (মিশর, সুমেরীয়, গ্রিক, হিব্রু, রােমান) সংক্ষিপ্ত পটভূমি উল্লেখ

২. সভ্যতা সমূহের উল্লেখযােগ্য অবদান চিহ্নিতকরণ ও ব্যাখ্যা

৩. প্রাচীন সভ্যতা সমূহের ধর্মীয় বিশ্বাস উল্লেখ

৪. মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে প্রাচীন সভ্যতা সমূহের প্রভাব ব্যাখ্যা

প্রাচীন সভ্যতা সমূহের (মিশর, সুমেরীয়, গ্রিক, হিব্রু, রােমান) সংক্ষিপ্ত পটভূমি উল্লেখ

মিশর সংক্ষিপ্ত পটভূমি:

সুপ্রাচীনকাল থেকেই নীল নদ মিশরের জীবনযাত্রায় মূল ভূমিকা পালন করছে। নীল নদের উর্বর প্লাবন সমভূমি এই অঞ্চলের অধিবাসীদের স্থায়ী কৃষি অর্থনীতি ও একটি জটিল ও কেন্দ্রীভূত সমাজ গঠনে সাহায্য করে যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি মাইলফলক রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক শিকারি-সংগ্রাহক মানুষেরা মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগের শেষ ভাগে অর্থাৎ বারো লক্ষ বছর আগে এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করেছিল। পরবর্তী প্যালিওলিথিক যুগ থেকেই উত্তর আফ্রিকার শুষ্ক জলবায়ু আরও উষ্ণ ও শুষ্ক হতে শুরু করে। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষেরা নীল নদ উপত্যকায় ঘন জনবসতি গড়ে তুলতে বাধ্য হয়।

সুমেরীয় সভ্যতা সংক্ষিপ্ত পটভূমি:

মেসোপটেমিয়ার উত্তরাংশে আক্কাদ ও দক্ষিণাংশে সুমের। এ সুমেরকে কেন্দ্র করেই আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দ নাগাদ মেসোপটেমিয়ায় এক উন্নত সভ্যতার উন্মেষ ঘটে। জাতিতে অসেমিটিক সুমেরবাসীই আদি মেসোপটেমিয়ার জনক। আনুমানিক ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সেমিটিক জাতির একটি শাখা দজলা ফোরাত (বর্তমানে টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস) উপত্যকায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে।

সমাজ ও সভ্যতার দিক দিয়ে অনগ্রসর এই সেমিটিক শাখাটিই স্থানীয় সুমেরীয়দের ঘরবাড়ি তৈরি, জলসেচ সর্বোপরি লিখন পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। সুমেরীয়রা সুসভ্য জাতি হলেও সুসংহত রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। বস্তুত সুমের অধ্যুষিত প্রাচীন বেষ্টিত এই সব নগর ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। প্রত্যেক নগররাষ্ট্রে জাগতিক ও আধ্যাতিক উভয় ক্ষেত্রে রাজাই ছিল সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

তবে কেন্দ্রিয় রাজশক্তির অভাবে প্রভুত্ব স্থাপনের জন্য রাজ্যগুলো পারস্পরিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত থাকত। সুমেরীয়দের সমাজে অর্থনৈতিক কাঠামো জটিলতার বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল না বরং সহজ-সরল ছিল। বাণিজ্য ছিল সুমেরীয়দের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক উৎস। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক দু’ধরনের বাণিজ্যই চালু ছিল। বাণিজ্যে বেসরকারী উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হতো সমুদ্র ও স্থল পথে সুমেরীয়রা নীল কান্তমনি, লালপাথর ও অন্যান্য পাথর এবং কাঠ আমদানি করতো। বয়নজাত দ্রব্য, অলংকার, যুদ্ধের অস্ত্র, প্রভৃতি রপ্তানি করতো।

সুমেরীয়রা বহু দেব-দেবীতে বিশ্বাসী ছিল। তাদের প্রধান দেব-দেবী ছিল শামাস, এনলিল, ইশতার, নারগল ও এনকি। সুমেরীয় সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান লিখন পদ্ধতির আবিষ্কার। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে সুমেরীয়রা পিকটোগ্রাফিক নামে লিখন পদ্ধতির সূত্রপাত ঘটায়। তারা বছরকে ১২ মাসে, দিন-রাত্রিকে ঘন্টায় এবং ঘণ্টাকে মিনিটে বিভক্ত করেছিল। দিন ও রাতের সময় নিরূপণের জন্য সুমেরীয়রা পানিঘড়ি ও স্বর্ণঘড়ি আবিষ্কার করে। তারাই প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ১দিন ও ৭ দিনে ১ সপ্তাহ নিয়ম প্রবর্তন করে। সুমেরীয়রা সূর্য ও চন্দ্রের আপেক্ষিক অবস্থিতি নির্ণয় করেছিল এবং গ্রহের সময় নিরূপণ করতে সক্ষম হয়েছিল। 

গ্রীক সভ্যতা সংক্ষিপ্ত পটভূমি:

মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে ক’টি দেশের মানুষ তাদের উজ্জ্বল অতীতের জন্য ঈর্ষণীয় গৌরবের অধীকারী গ্রিকরা তাদের অন্যতম । গ্রিক নামটি রোমানদের দেয়া। গ্রিসে জন্ম নিয়েছেন তাদের মধ্যে মহাকবি হোমার, জ্ঞানতাপস সক্রেটিস, স্থাপত্য-ভাস্কর্যের অবিস্মরণীয় দিকপাল ইকটিনাস ও ফিডিয়াস, রাজনীতি মঞ্চের অপ্রতিদ্বন্ধী কৌশলী থেমিস, টকলস, এরিস্টাইডিস ও পেরিক্লিস, সাহিত্যের অনির্বাণ জ্যোতিষ্ক সফোক্লিস, এরিস্টোফেলেস, ইউরিপাইডিস, দর্শনের শিখাগ্নী প্লেটো ও এরিস্টটল, ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস, থুকিডিডিস প্রমুখ মনীষীর আবির্ভাব এই গ্রিক সভ্যতায়। শিল্প, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্য প্রতিটি ক্ষেত্রে এর অবদান বিশ্ব সভ্যতায় উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।

গ্রীক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ কাল হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চাশ শতক থেকে শুরু করে কয়েক দশক পর্যন্ত স্থায়ী এথেন্সে পেরিক্লিসের শাসনামল। এই সময় বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা দর্শন সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চরম সাফল্য অর্জিত হয়। গণিত শাস্ত্রের সূচনা করে পিথাগোরাস অমর হয়ে আছেন। হিপোক্রেটিস চিকিৎসা শাস্ত্রকে কুসংস্কার মুক্ত করে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করান। 

হিব্রু সভ্যতা সংক্ষিপ্ত পটভূমি:

হিব্রু সভ্যতার উৎস ভূমি মধ্যপ্রাচ্যে। এ সভ্যতা আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরাইল অঞ্চল কেন্দ্রিক গড়ে ওঠেছিল। জাতিগত ভাবে হিব্রুরা ছিল একটি মিশ্রিত জাতি। কুটনীতি, স্থাপত্য এবং চিত্রকলার দিক থেকে হিব্রুরা সভ্যতার ইতিহাসে খুব অল্পই ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু নৈতিকতা ও ধর্মীয়ক্ষেত্রে বিশ্বসভ্যতায় হিব্রুদের অবদান ছিল যুগান্তকারী।

হিব্রুদের মূল নামের উৎপত্তিগত শব্দ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। প্রচলিত একটি মতে, খাবিরু বা হাবিরু নাম থেকেই হিব্রু হয়েছে। হিব্রু অর্থ বিদেশী, নিম্নবংশীয় বা যাযাবর। অধিকাংশ পণ্ডিতের মতেই হিব্রুদের আদিবাস ছিল আরবভূমিতে। তাদের প্রথম বসতি গড়ে ওঠে উত্তর-পশ্চিম মেসোপটেমিয়াতে। সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ অব্দে ইব্রাহীম (আ:) এর নেতৃত্বে হিব্রুদের একটি দল এখানে বসতি গড়ে তোলে। পরবর্তীতে ইব্রাহীম (আ:) এর ছেলে ইসমাইল (আ:) এর নেতৃত্বে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় থেকে তারা ইসরাইলি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। 

খ্রিস্টধর্মের পটভূমি তৈরিতে হিব্রুধর্মের ভূমিকাই ছিল বেশি। সৃষ্টিতত্ব, ঈশ্বরের একাত্ম, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আইনপ্রণেতা, ও পরম বিচারক হিসেবে ঈশ্বরের অবস্থান সম্পর্কিত বাইবেলের দুই তৃতীয়াংশে রয়েছে হিব্রু ধর্মের প্রভাব। দের সাহিত্যে ধর্মের প্রভাব ছিল প্রবল। ওল্ড টেস্টামেন্ট মূলত বিভিন্ন সাহিত্য কর্মের সংকলন। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হিব্রুদের তেমন অবদান নেই। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা কিছু অবদান রেখেছে। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে রোগ যন্ত্রনাকে ঈশ্বরের অভিশাপ বলা হয়েছে। 

রোমান সভ্যতা সংক্ষিপ্ত পটভূমি:

রোমান সভ্যতা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সভ্যতা। রোম, গ্রীস, কার্থেক ও প্যালেস্টাইন সহ ভূমধ্যসাগর অঞ্চল জুড়ে বিদ্যমান সকল রাষ্ট্রকে এটি যেমন অধিকার করে, তেমনি অধিকৃত রাষ্ট্রসমূহের শিল্প সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণা আত্মস্থ করে নিজস্ব অবদানে তা সমৃদ্ধও করে। বিশ্ব সভ্যতার ক্ষেত্রে রোমান সভ্যতার প্রধানতম অবদান রাজনৈতিক ও সরকার পরিচালনা ব্যবস্থা সংক্রান্ত রীতি পদ্ধতি। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে রোম শহরের পত্তন হয়। কালক্রমে টাইবার নদীর মোহনায় সাতটি পার্বত্য টিলাকে কেন্দ্র করে এই নগরীর বিস্তৃতি ঘটে। এই সাতটি নগরীকে নিয়ে পরে গড়ে তোলা হয় একটি একক নগররাষ্ট্র।
খ্রিস্টপূর্ব ২৮০ অব্দ নাগাদ রোমানরা বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে স্বাধীন মিত্রদের একটি শক্তিশালী সংঘ গঠন করে। রোমেই প্রথম আবিষ্কৃত হয় কংক্রিট। ফলে বিশাল ও আড়ম্বরপূর্ণ দালান কোঠা, খিলান ও গম্বুজ নির্মাণ করা সম্ভব হয় রোমক ভাস্কর্য শিল্পও এই সমৃদ্ধ সভ্যতার অন্যতম পরিচায়ক। চিকিৎসকগণ ল্যাটিন ভাষায় ঔষুধ পত্রের যে সব নাম লিখে থাকেন, তার মূলে ও রয়েছে এই সভ্যতার অবদান। এছাড়া বছরের বার মাসের নাম এখনো রয়েই গছে ল্যাটিন ভাষাতেই।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত জার্জিয়ান ক্যালেন্ডারের জন্ম ও ইতালিতে ইউরোপ মহাদেশের প্রধান ভূখণ্ডের দেশগুলোতে আইনী ব্যবস্থার বিকাশে রোমক আইনের অবদান অপরিসীম। এখনো দেশে দেশে রোমান আইন স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। গোথ, হুন ও ভান্ডালদের পৌনঃপুনিক আক্রমণে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে রোম সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
আরো বিস্তারিত দেখতে এখানে ক্লিক করুন